Thursday 29th September 2022

পাবলিক ভয়েস

পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি কণ্ঠস্বর

আর নেই সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ

মার্চ ১৯, ২০২২ by পাবলিক ভয়েস
No Comments

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। আজ শনিবার (১৯ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

তার জামাতা অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, তিনি গতকাল রাত থেকেই সিএমএইচে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের ছোট ছেলে সোহেল আহমদ তাকে মোবাইল ফোনে পিতার মৃত্যু সংবাদ দেন।

তিনি আরও জানান, সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধানের জানাজা ও দাফনের বিষয়ে এখনও কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তবে তিনি যেহেতু প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তাই হাইকোর্টে একটি জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাকে তার গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখানে একটি জানাজার পরে তাকে আবার ঢাকায় ফিরিয়ে এনে বনানী কবরস্থানে এনে দাফন করা হবে; যেখানে তার স্ত্রী ও কন্যা শায়িত আছেন।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পেমই গ্রামে ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম তালুকদার রিসাত আহমেদ; তিনি একজন সমাজসেবী ও এলাকায় জনহিতৈষী ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন।

সাহাবুদ্দীন ১৯৪৫ সালে নান্দাইলের চন্ডিপাশা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদায়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানি সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি প্রথমে লাহোরে সিভিল সার্ভিস একাডেমি এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সাহাবুদ্দীন আহমদ ম্যাজিস্ট্রেট, মহকুমা প্রশাসক এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালের জুন মাসে তাকে বিচার বিভাগে বদলি করা হয়। তিনি ঢাকা ও বরিশালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি তাকে বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারক পদে উন্নীত করা হয়।

১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাহাবুদ্দীন আহমদকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগ করা হয়। বিচারপতি হিসেবে তার দেওয়া বহুসংখ্যক রায় প্রশংসিত। বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর ওপর তার দেওয়া রায় দেশের শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক অনন্য ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তৎকালীন সরকার তার সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ১৯৭৮ সালের আগস্ট থেকে ১৯৮২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি তাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়। ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ পদত্যাগ করেন এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়। ওই দিনই রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করে উপরাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর ফলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার নেতৃত্বে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়, যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পায়।

সাহাবুদ্দীন আহমদের চাহিদা অনুসারে দেশের সংবিধানের ১১তম সংশোধনীটি আনা হয়। এর ফলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পরও তিনি ১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে যান এবং ১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন।

সাহাবুদ্দীন আহমদের স্ত্রী আনোয়ারা আহমদ দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে ২০১৮ সালে ৮০ বছর বয়সে মারা যান।

আর তাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ড. সিতারা পারভীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

তার দুই ছেলে শিবলী আহমদ ও সোহেল আহমদ গুলশানের গ্র্যান্ড প্রেসিডেন্ট কনকর্ড বাসায় বাবার সঙ্গেই থাকেন। আর দুই মেয়ে বর্তমানে শাহানা পারভীন ও সামিয়া পারভীন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.