https://public-voice24.com/wp-content/uploads/2022/03/favicon.ico-300x300.png
ঢাকাশুক্রবার , ৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

ইমরান খান, গদি হারানোর মুখে

পাবলিক ভয়েস
মার্চ ২২, ২০২২ ৫:১৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ক্ষমতা হারানোর দ্বারপ্রান্তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান৷ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সাড়ে তিন বছর যেতে না যেতেই ভাগ্য যাচাইয়ের মুখোমুখি পড়েছেন তিনি। বিরোধীদের চাপ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে আগামী শুক্রবার তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উঠছে পার্লামেন্টে। ভোটে হারলে পতন হবে তার সরকারের।

গতকাল পর্যন্ত বিরোধীদের যে পকিল্পনার কথা জানা গেছে, তাতে গদি হারানোর মুখে রয়েছেন ইমরান। আস্থা ভোট এড়িয়ে ইমরান ক্ষমতায় থাকতে চাইলে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

২০১৮ সালে ইমরান ক্ষমতায় আসার পর থেকে এবারের অনাস্থা প্রস্তাবটিকে তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এক বছর আগেও মার্চ মাসে পার্লামেন্টে আস্থা-অনাস্থার চ্যালেঞ্জে পড়েছিলেন তিনি। তখন ইমরান খানকে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখা গেলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার তাঁর নিজ দল পিটিআইয়ের আইনপ্রণেতাদের একাংশকে বিরোধী শিবিরে ভিড়তে দেখা যাচ্ছে।

এ মাসেই বিরোধী দলের জোটের পক্ষ থেকে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। বিরোধী দলগুলোর দাবি, পার্লামেন্টে ইমরান খান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের এক ডজনের বেশি সদস্য এখন তাঁর পাশে নেই। এমনকি তাঁর সরকারের জোট শরিকেরাও বিরোধী দলের প্রতি ঝুঁকেছেন।

রয়টার্স বলছে, ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক ক্ষমতাধর দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে ৮ মার্চ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেয় বিরোধী দলগুলো। এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির জন্য অধিবেশন ডাকতে স্পিকার আসাদ কায়সারের প্রতি লিখিত আবেদন জানায় তারা। পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, লিখিত আবেদন জমা পড়ার ১৪ দিনের মধ্যে স্পিকারকে আলোচনার জন্য অধিবেশন ডাকতে হবে। তার মানে হলো, ২২ মার্চের মধ্যে অধিবেশন আয়োজন করার কথা। তবে এদিনই আবার জাতীয় পরিষদে শুরু হচ্ছে ওআইসির দুই দিনব্যাপী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন।

পাকিস্তানের স্পিকারের কার্যালয় বলেছে, ওআইসির সম্মেলনের কারণে অধিবেশন দুই দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইমরান খানকে সরিয়ে দিতে নানা প্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের অর্থনীতি অব্যবস্থাপনা, পররাষ্ট্রনীতি ও সরকার পরিচালনা নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী তাঁর পুরো মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেননি।

পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ইমরান খানের জোটের শরিকদের ২০টি আসন রয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, ৩৪২ সদস্যবিশিষ্ট নিম্নকক্ষে উত্থাপিত অনাস্থা প্রস্তাব পাসের জন্য প্রয়োজন ১৭২ ভোট। পার্লামেন্টে ইমরান খানের রয়েছে ১৫৫ আসন।

ইমরান খানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন), পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) মিলিয়ে ১৬৩টি আসন রয়েছে। তবে ইমরান খানের দলছুট সদস্যদের ভোট তারা পেলে অনাস্থা প্রস্তাব সফল হবে বলে আশাবাদী তারা।

বিরোধী দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে ক্ষমতায় আসার জন্য দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন হবে। এর আগে ইমরান খান সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এদিকে ইমরান ক্ষমতায় টিকতে পারবেন কি না কিংবা ক্ষমতায় থাকার জন্য কোনো আইনি ফাঁকফোকর আছে কি না, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডন।

প্রতিবেদনের শুরুতে পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মিরের করা একটি সাম্প্রতিক টুইটের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে। ওই টুইটের সঙ্গে একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেন হামিদ মির। ভিডিওটি ২০২১ সালের ৪ মার্চ ধারণ করা। গত বছর অনাস্থা ভোটের আগে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে ইমরান খানের দেওয়া ভাষণ এটি।

সেখানে ইমরান খানকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা যদি আমার প্রতি খুশি না হন, তাহলে হাত তুলে বিরোধিতা প্রকাশ করতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আপনারা বলতে পারেন যে আপনারা ইমরান খানের সঙ্গে নেই। আমি আপনাদের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব। ধরে নেব আমি যোগ্য নই।’ এরপর ইমরান খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে যখন ভোটাভুটি হলো, তখন ১৭৮ জন আইনপ্রণেতা ইমরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হাত তুলেছিলেন। ওই আস্থা ভোটে টিকে যান ইমরান।

এক বছর পর একই সময়ে আবার অনাস্থা ভোটের মুখে ইমরান খান। তাঁর বিরুদ্ধে ৮ মার্চ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেয় বিরোধী দলগুলো। এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির জন্য অধিবেশন ডাকতে স্পিকার আসাদ কায়সারের প্রতি লিখিত আবেদন জানায় তারা। পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, লিখিত আবেদন জমা পড়ার ১৪ দিনের মধ্যে স্পিকারকে আলোচনার জন্য অধিবেশন ডাকতে হবে। এর মানে হলো, ২২ মার্চের মধ্যে অধিবেশন আয়োজন করার কথা। তবে এদিনই আবার জাতীয় পরিষদে শুরু হচ্ছে ওআইসির দুই দিনব্যাপী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। এমন অবস্থায় ২৫ মার্চ অধিবেশন ডেকেছেন স্পিকার।

সন্দেহ নেই, এক বছরে পাল্টেছে পরিস্থিতি। এখন আর আইনপ্রণেতাদের সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে ইমরানের মধ্যে আগের সেই আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে না। তিনি প্রধানমন্ত্রিত্বের যোগ্য কি যোগ্য নন, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ বলে মনে করেন না।

এখন প্রধানমন্ত্রী ইমরান মনে করেন, যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দেবেন, তাঁরা বিরোধী দলের কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জনসভায় এ অভিযোগ তুলতে দেখা গেছে তাঁকে। জাতীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তাঁর উপদেষ্টা ও অনুগত মন্ত্রীরাও একই ধরনের অভিযোগ করছেন। এখন পিটিআইয়ের পক্ষত্যাগীরা বিরোধী দলের আতিথেয়তা উপভোগ করছেন।

ইমরান খানকে এখন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তিনি যেন রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাদেশিক ভবনে অভিযান চালান, সিন্ধু প্রদেশে গভর্নরের শাসন আরোপ করেন এবং নিজ দলের সম্ভাব্য বিদ্রোহী সদস্যদের আগে থেকেই অযোগ্য ঘোষণা করেন। অথচ এক বছর আগেও নিজ দলের সদস্যের বিরোধিতাকেও তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কীভাবে এ কৌশলগুলো আইনসিদ্ধ উপায়ে ব্যবহার করতে পারেন।

ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সংবিধানে কিছু জরুরি বিধি রয়েছে। এ ছাড়া সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন। এর আগে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে দেশে জরুরি পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর কারণে পাকিস্তান কিংবা দেশটির কোনো অংশ যুদ্ধ, বহিঃশক্তির আক্রমণ কিংবা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাজনিত নিরাপত্তা হুমকিতে আছে।

আপাতত পাকিস্তানে যুদ্ধ কিংবা বহিঃশক্তির আক্রমণের পরিস্থিতি নেই। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি কোনো প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ইস্যুতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথা ভাবতে পারেন। তবে এ ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদ থেকে প্রস্তাব পাস করিয়ে নিতে হবে।

প্রেসিডেন্ট যদি এ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে নিজে নিজেই ব্যবস্থা নিতে চান, তবে প্রস্তাবটিতে পার্লামেন্টের দুই কক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে। পার্লামেন্টের প্রতিটি কক্ষ এ ক্ষেত্রে ১০ দিন করে সময় পাবে। এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রদেশের কার্যক্রম চলবে।

তবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কারণ দেখিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার এ প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখবে বলে মনে হয় না। কারণ, এ প্রচেষ্টা বিরোধীদের প্রতি সরকারের বিদ্বেষকে স্পষ্ট করে তুলবে। ইতিমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়েছে যে তাঁরা সত্যিকার অর্থে অনাস্থা ভোট থামাতে চান। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী অন্য কৌশলগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারেন।

পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় প্রাদেশিক পরিষদকে পাশ কাটিয়ে গভর্নরের শাসন জারি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রদেশের গভর্নর প্রেসিডেন্টকে জানাবেন যে সংবিধানের বিধির সঙ্গে সংগতি রেখে প্রাদেশিক শাসন চালানো যাচ্ছে না। তবে অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতির মতো এ ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত কারণ দেখাতে হবে। তা না হলে স্পষ্টতই বোঝা যাবে, সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারকে অপসারণের জন্যই এ পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

পিটিআই অভিযোগ করে আসছে যে বিরোধী দলগুলো তাদের দলের আইনপ্রণেতাদের কিনে নিচ্ছে। এ ধরনের কেনাবেচার প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আদেশ জারি করতে পারেন বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর গুঞ্জন রয়েছে। এ আদেশের ধরন কেমন হতে পারে, তা বলা মুশকিল।

তবে এ ধরনের আদেশ যদি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ‘৬৩-এ’–এর ঘোষিত বিধিনিষেধকেও ছাপিয়ে যায়, তাহলে এর মধ্য দিয়ে মৌলিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ, ৬৩-এ অনুচ্ছেদের আওতায় ঘোষিত বিধিনিষেধকেই ইতিমধ্যে কঠোর ও অগণতান্ত্রিক বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬২ ও অনুচ্ছেদ ৬৩ এর আওতায় আইনপ্রণেতাদের মনোভঙ্গি সম্পর্কে ধারণার ভিত্তিতে তাঁদের দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া খুব বেশি কিছু করার সুযোগ সরকারের হাতে নেই। তবে এমনটা করা হলে একই পদ্ধতি ব্যবহার করে দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা বাতিলের সুযোগ পেয়ে যাবে সরকার।