Thursday 29th September 2022

পাবলিক ভয়েস

পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি কণ্ঠস্বর

রাশিয়া ইউক্রেনে ‘মুখ রক্ষার’ জয় দেখাতে চাইছে

মার্চ ২৬, ২০২২ by পাবলিক ভয়েস
No Comments

ইউক্রেনে যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো পুনর্বিন্যাস করছে রাশিয়া। এটি এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে এই যুদ্ধে নিজের অর্জন নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেন একটি ‘মুখ রক্ষার’ বিজয় দাবি করতে পারেন। যুদ্ধে নিজ দেশের জয় দাবি করাটা যেন অন্তত তার জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। যদিও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনে আদতে অপমানজনক একটি ধাক্কা খেয়েছে রুশ বাহিনী।

২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে এই কথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে রাশিয়া। স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে দেশটির ওপর হামলা শুরু করে রুশ বাহিনী। রাজধানী কিয়েভ অভিমুখে যাত্রা করে ৪০ মাইল দীর্ঘ রাশিয়ান সামরিক বহর। তবে শেষ পর্যন্ত রাজধানী কিয়েভে প্রবেশ করতে পারেনি বহরটি। বরং মাঝপথে কিয়েভের উপকণ্ঠে গিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে এটি। স্যাটেলাইট ইমেজের তথ্য বলছে, কিয়েভের বাইরের বনাঞ্চল ও শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে ওই বহর। ম্যাক্সার টেকনোলজিসের স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও কামানের ৪০ মাইল দীর্ঘ কনভয় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কিয়েভের উত্তরে স্থবির থাকার পরে বেশিরভাগই কাছাকাছি শহর এবং বনাঞ্চলের দিকে চলে গেছে।

ডনবাসে মনোযোগ

শুক্রবার রাশিয়ার সেনাপ্রধান বলেছেন, পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলকে ‘পূর্ণাঙ্গভাবে মুক্ত’ করার ব্যাপারে অধিক মনোযোগ দেবে রুশ বাহিনী। কেননা, এটিই তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল। রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গত আট বছর ধরে এই অঞ্চলটিতে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে।

রাশিয়ান জেনারেল স্টাফের প্রধান অপারেশনাল ডিরেক্টরেটের প্রধান সের্গেই রুডসকোইয়ের দাবি, ‘অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্যগুলো সম্পন্ন হয়েছে।’ তিনি বলেন, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর দিক থেকে যুদ্ধের শঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে ডনবাসকে স্বাধীন করার রাশিয়ার মূল প্রচেষ্টার দিকে ফোকাস করা সম্ভব হবে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও দীর্ঘদিন থেকে কোনও প্রমাণ ছাড়াই ডনবাসের জাতিগত রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ চালানোর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করে আসছেন। কিন্তু পুরো ডনবাস দখল করা যদি শুরু থেকেই উদ্দেশ্য হতো তাহলে মস্কো ইউক্রেনে বড় ধরনের এই সামরিক অভিযান না চালিয়ে আরও সীমিত আকারে হামলা চালাতে পারতো। রুশ বাহিনীও ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারতো।

ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর একজন সাবেক কমান্ডার বেন হজেস। বর্তমানে ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্রে কর্মরত এই বিশ্লেষকের মতে, ‘অবশ্যই তারা (রাশিয়া) যা করতে প্রস্তুত ছিল তার সবকিছুতেই তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা এখন নিজেদের উদ্দেশ্যকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করছে, যাতে তারা বিজয় দাবি করতে পারে।’

বেন হজেস বলেন, ‘স্পষ্টতই তাদের বড় ধরনের টেকসই আক্রমণাত্মক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাদের লজিস্টিক সংকট সবার কাছেই স্পষ্ট, তাদের জনবলের গুরুতর সমস্যা রয়েছে এবং এমন প্রতিরোধ তারা কল্পনাও করতে পারেনি।’

কতটা মূল্য দিতে হচ্ছে রাশিয়াকে

ইউক্রেনে কথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ জন্য রাশিয়াকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। শুক্রবার রুশ বাহিনীর জেনারেল স্টাফ সের্গেই রুডস্কোই এক হাজার ৩৫১ রুশ সেনা নিহতের কথা স্বীকার করেছেন। যদিও ইউক্রেনের দাবি, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এর ১০ গুণ বেশি।

ডাচ সামরিক ব্লগ ওরিক্সে যাচাইযোগ্য ফটো এবং ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে উভয় পক্ষের সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। ওরিক্সের নথি অনুযায়ী, রাশিয়া এরইমধ্যে ইউক্রেনে ২৯৫টি ট্যাংক, ১৬টি বিমান, ৩৫টি হেলিকপ্টার, তিনটি জাহাজ এবং দুটি জ্বালানি ট্রেনসহ এক হাজার ৮৬৪টি হার্ডওয়্যার হারিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের ৭৭টি ট্যাংকসহ ৫৪০টি সরঞ্জাম হারানোর সত্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছে ওরিক্স।

প্রতিটি পক্ষই নিয়মিত শত্রুর সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি করে আসছে। কিন্তু কেউই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করে না।

লন্ডনের আরইউএসআই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার বিশ্লেষক নিক রেনল্ডস। তার মতে, রাশিয়ার জন্য তার মূল লক্ষ্যটি অর্জন করা এখন অসাধ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাদের মূল কৌশলটি ছিল ইউক্রেনের সরকারকে হটিয়ে দেওয়া। তবে স্পষ্টতই সেটি ঘটেনি।

পূর্ব ইউক্রেনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়াও রাশিয়ার জন্য খুব সহজ হবে, এমনটা মনে করার সুযোগ নেই। ডনবাস মূলত দুটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এরমধ্যে লুহানস্কের ৯৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। অন্যদিকে ডোনেস্কের মাত্র ৫৪ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে। ওদিকে অভিযান শুরুর এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি রুশ বাহিনী। উল্টো নিজেরাই এখন ‘মুখ বাঁচাতে’ ডনবাসের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে। এমন বাস্তবতায় ক্রমশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে ইউক্রেন।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ওলেক্সান্ডার গ্রুজেভিচ শুক্রবার বলেছেন, কিয়েভ দখলের জন্য রাশিয়ার তিন থেকে পাঁচগুণ বেশি সেনা সদস্য প্রয়োজন। ডনবাসের সঙ্গে অধিকৃত ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করার জন্য একটি স্থল করিডোর স্থাপনের রুশ প্রচেষ্টাও ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ছে বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.