Sunday 2nd October 2022

পাবলিক ভয়েস

পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি কণ্ঠস্বর

অবৈধ ভবনের ভাঙন ঠেকাতে ডেভেলপারের অভিনব জালিয়াতি

মার্চ ২৭, ২০২২ by পাবলিক ভয়েস
No Comments
নকশা না মেনে তৈরি করা ভবনের ভাঙন ঠেকাতে অভিনব ‘জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে রূপকথা হাউজিং কোম্পানির মালিক ইকবাল হোসেন লিটনের বিরুদ্ধে। ৬টি ভবনের ভাঙন ঠেকাতে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির একটি ‘অডিও’ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেন তিনি। কিন্তু দুদকে তার অভিযোগ ভুয়া প্রমাণিত হয়। এরপর দুদকের বিরুদ্ধেও বিষোদগার করেন ইকবাল হোসেন লিটন।
দুদক সূত্র জানিয়েছেনকশা অনুমোদনের জন্য রাজউকের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ৭-এর অথরাইজড অফিসার ‍প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুর আলমের বিরুদ্ধে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির একটি অডিও দুদকে জমা দেন ইকবাল হোসেন লিটন। দুদক তদন্ত করে ওই অডিওর সত্যতা পায়নি।

রাজউকের দাবি— লিটনের এসব অভিযোগ করে বেড়াচ্ছেন তার অবৈধ ভবনগুলোকে বাঁচাতে। ভবনগুলোর অবৈধ অংশ ভাঙতে এরইমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাঝে আবার ইকবাল আদালতে গিয়ে ভবনগুলোর বিষয়ে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞাও নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুর মৌজায় ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ জমির ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন ইকবাল হোসেন লিটন। ২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারি তাকে ছাড়পত্র দেয় রাজউক। ওই বছরের ২ ডিসেম্বর ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের আবেদন করেন তিনি।

ইকবালের নকশা বিধিমালা অনুযায়ী না হওয়ায় রাজউক সংশোধনী দিয়ে ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর চিঠি দেয়। তাতে বলা হয়প্রস্তাবিত প্লটটি লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট গ্রেগরিজ চার্চ হতে মাত্র ২০৪ মিটার দূরে। এতে প্রকল্প ছাড়পত্র দাখিল করা প্রয়োজন। পরের বছর ২৮ মার্চ আবেদন করেন ইকবাল। পরে রাজউক প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

সূত্রাপুর মৌজার ৩৩৮৭ নম্বর দাগে ২০১৫ সালে ইকবাল হোসেন লিটন দুটি ভবন নির্মাণ শুরু করেন। নকশার ব্যত্যয় ঘটানোয় তাকে নোটিশ দেন ইমারত পরিদর্শক আব্দুর রহমান। এরপর আব্দুর রহমান ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে দুদকে অভিযোগ করেন ইকবাল। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসারের বিরুদ্ধে আরও ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করে ২০১৯ সালের ৭ মার্চ দুদকে আরও একটি অভিযোগ দায়ের করেন ইকবাল।

ইকবালের দাখিল করা প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের ১১ জুলাই। কিন্তু প্রকল্পের নকশা দাখিলের আগেই ২০১৯ সালের ৭ মার্চ ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন তিনি। অভিযুক্ত প্রকৌশলীর দফতরে নকশা দাখিলের আগে ঘুষ দাবির বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করছে রাজউক।

তদন্ত করতে দুদক একই বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আমির হোসেনকে নিয়োগ দেয়। পরে আসেন সহকারী পরিচালক রাশেদ। তিনিও চালান দীর্ঘ অনুসন্ধান। ইকবালের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় গত বছরের ৩ অক্টোবর দুদকের সচিব মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের সই করা এক চিঠিতে ‍প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুর আলমকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা বলেনতারা চেষ্টা করেন যাতে কেউ অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করতে না পারে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চমহলের নির্দেশে বিষয়টি নিয়ে তারা আরও কঠোর হয়েছেন। কিন্তু অনেক আবাসন ব্যবসায়ী ও ভবন মালিক রাজউকের এ কাজ বন্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। এজন্য বিভিন্ন সময় কর্মকর্তাদের নামে ‘বানোয়াট’ অভিযোগ তুলে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রাজউকের।

এদিকে রাজউকের অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ইকবাল হোসেনের প্রতিষ্ঠান নগরীর কুলুটোলা এলাকায় ৩টি, সায়েদাবাদ রেললাইনের পাশে ১টি এবং লক্ষ্মীবাজার এলাকায় ২টিসহ ছয়টি ভবন নির্মাণ করে। রাজউকের পরিদর্শনে দেখা যায়রাস্তার জন্য কোনও জমি ও সেট-ব্যাক না রেখেই ভবনগুলো বানানো হয়েছে। পার্কিংয়ের স্থানে ইকবালের কোম্পানির অফিস তৈরি করা হয়েছে। ভবন ব্যবহারের জন্য রাজউক থেকে অকুপেন্সি সনদও নেননি তিনি। পরে নিজের ভবনের বিষয়ে উচ্চ আদালত থেকে ছয় মাসের স্টে অর্ডার নেন ইকবাল।

রাজউকের অভিযোগ— স্থগিতাদেশ নেওয়া হলেও  নির্মাণকাজ ঠিকই অব্যাহত রেখেছেন ইকবাল। এছাড়া ভবটিতে অবৈধভাবে হোস পাইপের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগও দিয়েছেন। রাজউক জানিয়েছে, বিষয়টি আদালতের দৃষ্টিগোচর করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন লিটন বলেনপ্রকৌশলী নুর আলম তার কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। তিনি সেটার অডিও রেকর্ড দুদকে জমা দিয়েছেন।

নকশার ব্যত্যয় প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ৯৫ ভাগেরও বেশি ভবন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে বানানো। পুরান ঢাকার কোনও মানুষই জমি ছাড়েন না। ব্যাংকগুলোও ১৪ শতাংশ পর্যন্ত ডেভিয়েশন গ্রহণ করে। আমরা ভবনগুলো কোনও নিয়ম ভাঙেনি। আমাকে হয়রানির জন্য এসব চিঠি দেওয়া হয়। আমি আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।

অপরদিকে রাজউকের প্রকৌশলী নুর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি যে অভিযোগ দাখিল করেছেন তা বানোয়াট। তিনি তার নিয়মবহির্ভূত ভবনের ভাঙন ঠেকাতে মরিয়া। তবে রাজউক ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.